বুধবার   ২২ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৮ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

চিরনিদ্রায় শায়িত ‘সোনার টুকরা আদিবা’

আলোকিত লক্ষ্মীপুর

প্রকাশিত : ১০:৩৬ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মঙ্গলবার রাত পৌনে ৩টার দিকে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় মহিন আহমেদ সোহেল ও নাজমা আক্তার দম্পতির ২৬ মাস বয়সী একমাত্র মেয়ে আদিবা আক্তার ছোঁয়াকে। এ ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন সোহেল ও নাজমা।

বুধবার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) বেডে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথা বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত নাজমা আক্তার।

তিনি বলেন, অনেক শান্ত ছিল আমার মেয়েটি। শান্ত স্বভাবের বলে সবাই তাকে আদর করতো। দুই ছেলে-মেয়ে আর স্বামী সংসার নিয়ে অনেক সুখে ছিলাম। ট্রেন দুর্ঘটনা মেয়েকে কেড়ে নিয়েছে। মারা যাওয়ার আগে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেও মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। 

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাঁচার তাগিদে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বানিয়াচং ছেড়ে চট্টগ্রামে গার্মেন্টে চাকরি করতেন সোহেল ও নাজমা। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসবাস করতে। সঙ্গে থাকতেন নাজমার মা রেনু আক্তার। তাদের অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানকে দেখাশোনা করতেন তিনি।

দুর্ঘটনার রাতে গ্রামের বাড়ি বানিয়াচং থেকে কর্মস্থল চট্টগ্রাম ফেরার পথে দুই ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী ও শ্বাশুড়ি রেনু আক্তারকে নিয়ে রাত সাড়ে ১২টায় শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ ট্রেনে ওঠেন সোহেল। রাত পৌনে ৩টার দিকে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয় তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে আদিবা।  

মঙ্গলবার সকালে মৃত্যুর খবর আসে বাড়িতে। সঙ্গে সঙ্গে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে। সারাদিন আদিবার মরদেহ পড়ে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের ফ্লোরে। এমন একটি ছবিও নিমেষেই ভাইরাল হয়ে যায় ফেসবুকে। যে ছবিটি নাড়া দেয় দেশবাসীর হৃদয়কে। পরে ওই দিন বিকেলে বাড়ি থেকে লোকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল থেকে আদিবার মরদেহ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। এত আদরের মেয়েকে শেষবারের মতো দেখা হলো না মা-বাবার। তাদের অনুপস্থিতিতেই সমাহিত করা হলো সোনার টুকরো আদিবাকে।

বুধবার বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার তাম্মলিটুলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়- শোকে স্তব্ধ চারপাশ। শুনসান নিরবতা বিরাজ করছে আদিবার বাড়িতে। আদিবার বিষয়ে জানতে চাইলেই হাওমাও করে কেঁদে উঠেন আদিবার স্বজনরা। তাদের কান্নায় চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি সেখানে উপস্থিত কেউই। এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

শিশু আদিবার দাদি সামছুন্নাহার বেগম বলেন, আমার নাতনি যখনই বাড়িতে আসত তখনই আমার কত ভালো রাগত। সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকত। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত। খাবার খাওয়ার পর আমাকে পানের ভাড়া এনে দিয়ে বলত ‘দাদি আমি তুমাকে পান বানিয়ে দেই?  আজ আমার নাতনি এই পৃথিবীতে নেই ভাবতেই পারছি না। এই বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

সোহার ফুফু জাহানারা বেগম বলেন, আদিবা অনেক মিষ্টি মেয়ে ছিল। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত বলে আমরা ইচ্ছে করেই থাকে শুধু শুধু কথা বলাতাম। কিন্তু এখন আর আমাদেরকে আদিবা কোনো কথা বলবে না। সোহামণির বাবা-মা খুব দরিদ্র। তারা ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। ভালো চিকিৎসা করার সামর্থ তাদের নেই। তাই  সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। 

প্রতিবেশি সেলিম আহমেদ বলেন, মেয়েটি অনেক মিষ্টি ছিল। আমাদের সঙ্গে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত। কিন্তু আজ এই মেয়েটি দুনিয়াতে নেই। এছাড়া মেয়েটির মা-বাবাও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তারা খুব দরিদ্র, তাই সরকারের কাছে তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও কিছু আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানাই। 

ইমদাদুল হোসেন খান বলেন, এত ছোট নিষ্পাপ মেয়েটি এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে তা মেনে নিতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। তার মা-বাবাও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি। পরিবারটি খুব দরিদ্র, তাদের পক্ষে ভালো চিকিৎসা করানো সম্ভব না। তাই সরকারের কাছে দাবি তাদেরকে যেন উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।  

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল বলেন, আমরা পরিবারটিকে সহযোগিতা করার চেষ্ট করছি। এছাড়া সরকারও যদি তাদের একটু বেশি করে সহযোগিতা করে তাহলে ভালো হয়। 

এ ব্যাপারে ইউএনও মামুন খন্দকার বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনায় বানিয়াচংয়ের দুইজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ১২ জন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত দুই পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। আমরা আরো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছি। 

এদিকে, বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের একটি করবস্থানে চির নিন্দ্রায় শায়িত করা হয়েছে আদিবাকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় মা-বাবার আদরের সোনার টুকরাকে সমাহিত করে সবুজ কলাপাতা দিয়ে কবরটি ডেকে রাখা হয়েছে। এ সময় উপস্থিত অনেকেই দীর্ঘ নিঃস্বাস ফেলে বলছিলেন, যে মেয়েটিকে এতো ভালোবাসত, সেই মেয়েটিকে শেষ দেখা দেখারও ভাগ্য হলো না তাদের।